দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চলমান সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংকট নিরসনে ইতোমধ্যে নেওয়া পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
রোববার বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত
এ বৈঠকে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং জ্বালানি
সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিভিন্ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু,
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এবং জ্বালানি সচিব মো.
জিয়াউল হক উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক তেলবাজারের
অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহে তৈরি হওয়া চাপ মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার
ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের
ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকে এলপিজি ও এলএনজি আমদানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি
দেশে নতুন গ্যাসকূপ খনন ও অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের বিষয়ে দিকনির্দেশনা
দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করে দ্রুত
বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের স্থলভাগে ১৫০টি
গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে ৩২টি কূপের ড্রিলিং ও ওয়ার্কওভার শেষ হয়েছে।
এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ২৮৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট
সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক
দরপত্রেও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ রয়েছে। এখন পর্যন্ত ১০টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান
দরপত্র ও তথ্য প্যাকেজ কিনেছে। আগামী ৩০ নভেম্বর দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারিত
রয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের
ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বৈঠকে। জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার
পাশাপাশি সরকারি ভবন, হাসপাতাল, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও শিল্পকারখানায়
রুফটপ সোলার স্থাপনের কার্যক্রম আরও জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায়
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানাগুলোতেও সৌর প্যানেল স্থাপনে
উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকের বাড়িতে স্থাপিত সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ
বিক্রির সুযোগও রাখা হয়েছে।
বৈঠকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ, সরকারি অফিসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ
যন্ত্রের তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমায় রাখা এবং প্রয়োজন ছাড়া বাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম
বন্ধ রাখার নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হয়।
বিশ্ববাজারে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানি ব্যয়
বাড়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবেও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। চারটি
দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আটটি এলএনজি আমদানি চুক্তি রয়েছে। চলতি বছরে ১০৩টি এলএনজি কার্গো
আসার কথা থাকলেও প্রথম নয় মাসে এসেছে মাত্র ২১টি।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত অনেক কার্গো না আসায় স্পট মার্কেট
থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহ
ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশের নিজস্ব কয়লা সম্পদ ব্যবহারের বিষয়টিও
গুরুত্ব পাচ্ছে। বড়পুকুরিয়ায় নতুন করে প্রায় ৩০০ একর এলাকায় কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু
হয়েছে। জয়পুরহাটের জামালগঞ্জেও কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।
ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে উত্তোলনের বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে
স্থানীয় জনগণের আয়-রোজগার, বসতি ও পরিবেশের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত
নেওয়া হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট ও ভূরাজনৈতিক
অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গ্যাস, কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির
ব্যবহার বাড়ানোই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অন্যতম পথ। এ কারণেই বৈঠকে দ্রুত গ্যাস
অনুসন্ধান, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দ্যা প্রেস নিজ/এসআর
মন্তব্য করুন