নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি মসজিদের সামনে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে টুপি, আতর ও জায়নামাজসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সামগ্রী বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন মো. আকরাম হোসেন। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা তাঁর ‘আকরাম টুপি হাউস’ এখন হাতছাড়া। দোকান থেকে মালামাল সরিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ায় পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এই ব্যবসায়ী। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর আফরোজা আফরোজ ভিবা হাসান এবং তাঁর স্বামী মহানগর বিএনপি নেতা হাসান আহম্মেদের বিরুদ্ধে হুমকি, মারধর, জোরপূর্বক স্বাক্ষর গ্রহণ ও দোকান দখলের অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
ভুক্তভোগী আকরাম হোসেনের জানান, দীর্ঘদিন ধরে দোকানটি পরিচালনার জন্য তিনি নিয়মিত ভাড়া দিয়ে আসছিলেন। দোকান নির্মাণেও নিজের সঞ্চয়ের বড় অংশ ব্যয় করেছেন। বিভিন্ন সময়ে অগ্রিম বাবদ প্রায় ৯ লাখ টাকার বেশি দেওয়ার পাশাপাশি ভিবা হাসানের কাছে তাঁর আরও ২ লাখ টাকা জমা ছিল বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু কয়েক মাসের ভাড়া বকেয়া হওয়ার জেরে তাঁকে দোকান থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
আকরাম হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি মসজিদের সামনে বাংলাদেশ রেলওয়ের জায়গায় প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি ধর্মীয় সামগ্রীর ব্যবসা করে আসছিলেন। তাঁর দাবি, ওই জায়গার ভাড়া মহানগর বিএনপি নেতা হাসান আহম্মেদ আদায় করতেন এবং তাঁকে নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করতেন তিনি।
প্রথমদিকে দোকানটি টিনশেডের ছিল। পরে সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর আমলে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলে দোকানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর নিজের জমানো টাকা দিয়ে ইট-সিমেন্টের কাঠামো তৈরি করে আবারও ব্যবসা শুরু করেন আকরাম।
তিনি অভিযোগ করেন, দোকান পরিচালনা ও জায়গাটি ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সময়ে অগ্রিম অর্থ দিতে হয়েছে তাঁকে। সব মিলিয়ে ৯ লাখ টাকার বেশি দেওয়ার দাবি করলেও এসব অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, লেনদেনের প্রমাণ এবং জায়গাটি ব্যবহারের বৈধ অনুমতিপত্রের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আকরাম হোসেনের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায় মন্দা দেখা দেওয়ায় চার মাসের ভাড়া বকেয়া পড়ে। গত ৪ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১১টা ৪৭ মিনিটে তাঁকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, সাবেক কাউন্সিলর ভিবা হাসানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে মারধর করতে করতে ভিবা হাসানের কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে জোর করে তিনটি অলিখিত সরকারি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করানো হয়। একই সঙ্গে রেলওয়ের তিন শতাংশ জায়গা-সংক্রান্ত লাইসেন্সের আবেদনের মূল কপিটিও তাঁর কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন আকরাম।
আকরাম হোসেনের দাবি, দোকানটি ধরে রাখতে তিনি পাশের ‘জান্নাত ক্যাপ হাউস’-এর মালিক মো. সিহাবের কাছ থেকে টাকা ধার করেন। পরে সেই টাকা দিয়ে ভিবা হাসানের দাবি করা বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, ভাড়া পরিশোধের পর আগের মতো দোকানে ব্যবসা করতে পারবেন।
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা পরিশোধের পরও তাঁকে দোকানে ফিরতে দেওয়া হয়নি। বরং তাঁর দোকানের সব মালামাল বের করে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাঁর ধর্মীয় সামগ্রী অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয় এবং দোকানটি অন্য এক ব্যক্তির কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আকরামের ভাষ্য, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অনুনয়-বিনয় করেও তিনি দোকানটি ফেরত পাননি। দীর্ঘদিনের পরিচিত ব্যবসা ও আয়ের একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে এখন তিনি দিশেহারা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আকরাম হোসেন বলেন, ‘আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে সেখানে ব্যবসা করছি। নিয়মিত ভাড়া দিয়ে নিজের টাকায় দোকানটি তৈরি করেছি। বিভিন্ন সময়ে অগ্রিম টাকাও দিয়েছি। ব্যবসায় মন্দার কারণে কয়েক মাসের ভাড়া বকেয়া পড়েছিল। পরে ধার করে সেই টাকাও পরিশোধ করেছি। তারপরও আমার দোকানটি ফেরত পাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার দাবি, ভিবা হাসানের কাছে আমার ২ লাখ টাকা জমা ছিল। এত বছর ব্যবসা করে যা গড়ে তুলেছিলাম, এখন সব হারিয়ে ফেলেছি। আমার তিন মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে কীভাবে চলব, বুঝতে পারছি না। আমি ন্যায়বিচার চাই এবং আমার দোকানটি ফেরত চাই।’
ঘটনাটিতে দোকান দখলের অভিযোগের পাশাপাশি বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি ব্যবহারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আকরাম হোসেনের দাবি, তিনি রেলওয়ের তিন শতাংশ জায়গার জন্য লাইসেন্সের আবেদন করেছিলেন। তবে আবেদনটি কোন পর্যায়ে ছিল, জায়গাটি ব্যবহারের অনুমতি কার নামে ছিল এবং ভাড়া আদায়ের আইনগত ভিত্তি কী এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।
রেলওয়ের জমি ব্যক্তিগতভাবে ভাড়া দেওয়া বা সেখানকার স্থাপনার দখল হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও প্রযোজ্য নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ। তাই জায়গাটির মালিকানা, ইজারা বা লাইসেন্সের কাগজপত্র এবং অর্থ লেনদেনের নথি পরীক্ষা করে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
দোকান হারিয়ে পরিবার নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়া আকরাম হোসেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁর দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোকান থেকে মালামাল সরিয়ে নেওয়া, জোরপূর্বক স্বাক্ষর গ্রহণ এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হোক।তিনি নিজের দীর্ঘদিনের ব্যবসা ফিরে পাওয়া এবং আর্থিক ক্ষতির প্রতিকার চান।
এ বিষয়ে সাবেক কাউন্সিলর আফরোজা আফরোজ ভিবা হাসানকে একাধিক বার কল করেও পাওয়া যায়নি তাই তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
দ্যা প্রেস নিউজ/এসআর
মন্তব্য করুন