বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের খুচরা বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের দামে বড় ব্যবধান দেখা দিয়েছে। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়। ফলে ভোক্তাকে নির্ধারিত দামের তুলনায় সর্বোচ্চ ৫৬৩ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে।
খুচরা বিক্রেতারা এ পরিস্থিতির জন্য ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস কেনাকে দায়ী করছেন। আবার ডিলারদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কোম্পানি থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। আর ভোক্তাদের অভিযোগ, নিয়মিত বাজার তদারকি না থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে বাড়তি দামের প্রভাব তাদের ওপর পড়ছে।
গত রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে বোতলজাত এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করে বিইআরসি। এতে প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা। সে হিসাবে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। বাজারে সাড়ে ৫ থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন ওজনের সিলিন্ডার পাওয়া যায়।
তবে নারায়ণগঞ্জের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নগরীর বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি অন্যান্য উপজেলাতেও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা।
নগরীর ভাষা সৈনিক সড়কের ফুটপাতে চায়ের দোকান চালান মো. ইমন। রোববার বিকেলে তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৪০০ টাকায়। অথচ এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে একই সিলিন্ডার কিনেছিলেন ২ হাজার টাকায়।
ইমনের অভিযোগ, বাজারে গ্যাসের সরবরাহ নিয়েও সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, দাম বাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে আগেই সিলিন্ডার মজুত করছেন। শনিবার গ্যাস না পাওয়ায় তাকে দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনেছেন।
আরেক দোকানি মো. রাসেল জানান, তিন দিন আগেও ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৩০০ টাকায়। তার অভিযোগ, সরকারি দামের চেয়ে প্রায় ৫০০ টাকা বেশি দিয়েও তাকে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
রাসেলের ভাষায়, সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হলেও সেটি বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না। নিয়মিত তদারকি থাকলে এভাবে অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনতে হতো না।
সদর উপজেলার কাশীপুর খিলমার্কেটের বিক্রেতা হাবিবুর রহমান বলেন, ডিলার পর্যায়েই ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানি ও ডিলারভেদে সিলিন্ডারের দামেও পার্থক্য রয়েছে।
তার দাবি, বেশি দামে কিনতে হওয়ায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন তারা।
নগরীর ভূঁইয়াপাড়ার বিক্রেতা মো. হাসানও সরবরাহ সংকটের কথা জানান। তিনি নিতাইগঞ্জের এক ডিলারের কাছ থেকে এলপিজি সংগ্রহ করেন। হাসানের ভাষ্য, দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তিনি চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাচ্ছেন না।
হাসান বলেন, ডিলারও ঢাকা থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন। ফলে সরবরাহ কম থাকায় ডিলার পর্যায়ে দাম বেড়েছে এবং সেই বাড়তি মূল্য খুচরা বাজারেও প্রভাব ফেলছে।
নগরীর দুটি এলপিজি ডিলারশিপ প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ডিলার জানান, কোম্পানি সিলিন্ডারের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে পরিবহন, জায়গার ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে দামের ওপর প্রভাব পড়ছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন রবিন জানান, কোথাও কোথাও সরকারি মূল্যের তুলনায় ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক বিক্রেতা পণ্য বিক্রির পর রসিদও দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ তার।
রবিন বলেন, বাজারে সরবরাহ না থাকার কথা বলা হলেও বেশি দাম দিলে অনেক সময় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে। ডিলাররা খুচরা বিক্রেতাদের ওপর এবং খুচরা বিক্রেতারা ডিলারদের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। এভাবে পরিস্থিতি চলতে পারে না।
তার মতে, শুধু এলপিজির দাম নির্ধারণ করলেই হবে না; বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি ও মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক হৃদয় রঞ্জন বনিকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি ঠেকাতে বাজার তদারকি শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির। তার তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে সদর উপজেলার অন্তত তিনটি দোকানকে জরিমানা করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, এলপিজি বিতরণকারীদের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। আমদানি পর্যায় থেকে শুরু করে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয়ে তথ্য নেওয়া হচ্ছে।
তার ভাষ্য, বেশি দামে কেনা ও বিক্রির যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটি নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ও জেলা পর্যায়ে কাজ চলছে।
দ্যা প্রেস নিউজ/এফজে
মন্তব্য করুন