বলিউডের অভিনয়জগতে নানা পাটেকর বরাবরই ছিলেন ব্যতিক্রমী এক নাম। অভিনয়ের প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ নেওয়া অনেক অভিনেতার ক্ষেত্রেই দেখা যায়। কিন্তু সেই প্রশিক্ষণকে বাস্তবে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের সময় সরাসরি সেনাসদস্যদের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনা নিঃসন্দেহে বিরল। এমনই এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন ভারতের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকর।
৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো বহুমাত্রিক এই অভিনেতার দীর্ঘ
ক্যারিয়ার। অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাতা ও সমাজসচেতন মানুষ হিসেবেও নানা পাটেকরের পরিচিতি
ছিল। তবে তার জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময়
ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে কাটানো প্রায় দুই মাস।
১৯৯১ সালে মুক্তি পায় নানা পাটেকর অভিনীত ও পরিচালিত সিনেমা ‘প্রহার:
দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’। সিনেমাটিতে মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির মেজর ভি এস ছাবানের চরিত্রে
অভিনয় করেন তিনি। চরিত্রটিকে বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তুলতে অভিনয়ের আগে তিনি সত্যিকার
অর্থেই সেনাবাহিনীর কঠোর প্রশিক্ষণ নেন।
নানার সেই প্রশিক্ষণের বিষয়টি তখনই আলোচনায় আসে। ১৯৯২ সালে এ নিয়ে
প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘ইন্ডিয়া টুডে’। তবে সিনেমার জন্য নেওয়া সেই সামরিক প্রশিক্ষণই
কয়েক বছর পর তাকে নিয়ে যায় একেবারে বাস্তব যুদ্ধের ময়দানে।
১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের কার্গিল যুদ্ধ শুরু হলে নানা পাটেকর
সেনাদের পাশে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। যুদ্ধের খবর শুনে তিনি তৎকালীন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
জর্জ ফার্নান্দেজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে থাকার
আগ্রহের কথা জানান তিনি।
প্রথমে বিষয়টি সহজভাবে নেওয়া হয়নি। কারণ সাধারণ কোনো নাগরিক চাইলেই
যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ এলাকায় অবস্থান করতে পারেন না। তবে নানা
পাটেকর জানান, তিনি আগে কমান্ডো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং আগ্নেয়াস্ত্র ও রাইফেল শুটিংয়ে
জাতীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
নানার সামরিক প্রশিক্ষণ ও শুটিংয়ের অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনা করে শেষ
পর্যন্ত তাকে যুদ্ধ এলাকায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
পরে কার্গিলের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে প্রায় ৬০
দিন অবস্থান করেন নানা পাটেকর। দ্রাস, লেহ, কুপওয়ারা, বারামুল্লা ও সোপুরসহ বিভিন্ন
এলাকায় তিনি সেনাদের সঙ্গে সময় কাটান। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি ছিলেন
তাদের পাশে।
শুধু সেনাদের সঙ্গে অবস্থান করাই নয়, যুদ্ধের সময় তিনি ‘কুইক রিঅ্যাকশন
টিম’-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বলে পরবর্তী সময়ে জানিয়েছিলেন নানা। তবে ওই সময় তিনি ঠিক
কী ধরনের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি। সামরিক বিধিনিষেধের কারণেই
এসব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
কার্গিল যুদ্ধের প্রায় ২৫ বছর পর, ২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে সেই অভিজ্ঞতার
কথা স্মরণ করেন নানা পাটেকর। তিনি জানান, যুদ্ধের সময় সেনাদের সঙ্গে থাকার সুযোগ পাওয়াটা
তার কাছে ছিল অত্যন্ত আবেগের এবং গর্বের বিষয়।
সেই সময়ের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে নানা বলেছিলেন, তিনি নিজেকে খুব
সুখী মনে করছিলেন। কারণ দেশের জন্য অন্তত কিছুটা হলেও করতে পেরেছেন—এটাই ছিল তার কাছে
সবচেয়ে বড় তৃপ্তির বিষয়।
কার্গিল যুদ্ধের পর অনেক বলিউড তারকাই আহত সেনাসদস্যদের সঙ্গে দেখা
করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন সরাসরি সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ এলাকায় প্রায় দুই
মাস অবস্থান করার ঘটনা নানা পাটেকরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে।
পর্দায় সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে যে মানুষটি সামরিক
প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, কয়েক বছর পর বাস্তবেই সেই প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন
দেশের সৈনিকদের পাশে। তাই নানা পাটেকরের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের বহু স্মরণীয় চরিত্রের পাশাপাশি
কার্গিলের যুদ্ধময়দানে তার সেই উপস্থিতিও থেকে যাবে আলাদা এক অধ্যায় হয়ে।
দ্যা প্রেস নিজ/এসআর
মন্তব্য করুন